সফল জীবনের জন্য বন্ধুত্ব
আমরা মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব।আমাদের বলা হয় আশরাফুল মাখলুকাত।মানুষ
কখনও একা থাকতে পারে না বা চলতে পারে না।জীবনের প্রতিটি সময়ে তার একজন বন্ধু বা সঙ্গী
প্রয়োজন হয়।কেননা মানুষ সামাজিক জীব। তাদের জন্মই হয়েছে সমাজবদ্ধ হিসেবে বাস করার জন্য।সমাজ গড়ে ওঠে সমষ্টিকে নিয়ে, একাকি সমাজ গঠিত হয় না। সমাজে বিচিত্র শ্রেণীর লোক বাস করে। একেক জনের পেশা একেক রকম। তাই সমাজে একজনকে আরেকজনের প্রয়োজন পড়ে। এটা আল্লাহর এক অশেষ নিয়ামত।আর
এই কারনেই সমাজবদ্ধতার প্রশ্নে মানুষ একে অপরের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে। সঠিকভাবে যথার্থ বন্ধু নির্বাচন করার মধ্য দিয়ে মানুষ তার সামাজিক এবং ব্যক্তিগত জীবনকে সুষ্ঠু ও নিরাপদ করে তোলে।তছাড়া
বন্ধুত্ব তৈরী মানুষের স্বভাবজাত প্রবণতা। ভালো বন্ধু ও সুন্দর বন্ধুত্ব জীবন যাত্রার সহায়ক এবং আল্লাহর নিয়ামত ।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক বলেনঃ
“মুমিন পুরুষ ও নারীগণ পরষ্পর একে অন্যের বন্ধু ও সাহায্যকারী ।” -সূরা তাওবাহ
“মুমিন পুরুষ ও নারীগণ পরষ্পর একে অন্যের বন্ধু ও সাহায্যকারী ।” -সূরা তাওবাহ
মহানবী (সাঃ) বলেছেনঃ " মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়, সুতরাং প্রত্যেক ব্যাক্তির চিন্তা করা দরকার সে কার সাথে বন্ধুত্ব করছে ।"
তিনি
আরও বলেছেনঃ "একাকী নিঃসঙ্গতার চেয়ে ভালো বন্ধু উত্তম আর নিঃসঙ্গতা মন্দ বন্ধুর চেয়ে উত্তম।"
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এরিস্টটল বলেছেন: 'দুটি দেহে একটি আত্মার অবস্থানই হলো বন্ধুত্ব।'
এমারসন বলেছেন: 'প্রকৃতির সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টির নাম বন্ধুত্ব।'
কিন্তু এখন কথা হচ্ছে আমরা
কাদের সাথে বা কেমন প্রকৃতির লোকদের সাথে বন্ধুত্ব করব ?
আসুন তাহলে জেনে নিই বন্ধুত্বের
মাপকাঠি কি হবে।
১।পবিত্র কোরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন, যে বিচ্যুত এবং ফাসেকের সাথে বন্ধুত্ব করে সে আসলে নিজের ওপর নিজেই জুলুম করে। কিয়ামতের দিন তাদের অবস্থা সম্পর্কে কোরআন বলেছেঃ "হায় আমার দুর্ভাগ্য! আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম! আমার কাছে উপদেশ আসার পর সে আমাকে তা থেকে বিভ্রান্ত করেছিল। শয়তান মানুষকে বিপদকালে ধোঁকা দেয়।" বাংলা ভাষায় একটি প্রবাদ আছেঃ "উত্তম নিশ্চিন্তে চলে অধমের সাথে, সে-ই অধম যে চলে তফাতে।" অর্থাৎ যে ভালো, তার কোনো ভয় নেই, সে ভালো-মন্দ সবার সাথেই বিনা দ্বিধায় চলতে পারে, কেননা সে খারাপ হবে না, খারাপের মাধ্যমে প্রভাবিত হবে না। তাই যে মন্দের প্রভাবের আশঙ্কায় অধমকে এড়িয়ে চলে, সে নিজেই অধম।
২।মহানবী (সাঃ) বলেছেন যে: "মুমিন ব্যাক্তির সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক মজবুত কর । তার সাথেই পানাহর করো ।"
৩।রাসূল (সাঃ) আরও বলেছেনঃ
“কিয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালা বলবেন, ঐসব লোকেরা কোথায় , যারা শুধু আমার জন্যই লোকদের সাথে বন্ধুত্ব করতো । আজ আমি তাদেরকে আমার ছায়ায় স্হান দেবো ।”-মুসলিম
“কিয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালা বলবেন, ঐসব লোকেরা কোথায় , যারা শুধু আমার জন্যই লোকদের সাথে বন্ধুত্ব করতো । আজ আমি তাদেরকে আমার ছায়ায় স্হান দেবো ।”-মুসলিম
৪।রাসূল (সাঃ) বলেছেন: “শেষ বিচারের দিন সকল বন্ধুই শত্রুতে পরিণত হবে তবে একমাত্র সৎ বন্ধুই সেদিন প্রকৃত বন্ধু হিসেবে পরিচয় দেবে। তাই বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে সততা, আমানতদারি, সত্যবাদিতা, বিশ্বস্থতা প্রভৃতি গুণের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে।”
৫।ইমাম গাযযালী (রহঃ) বলেন: 'সবাইকে
বন্ধু নির্বাচন করা যাবে না, বরং তিনটি গুণ দেখে বন্ধু নির্বাচন করা উচিত। গুণ তিনটি(৩)
হল:-
ক. বন্ধুকে হতে হবে জ্ঞানী ও বিচক্ষণ
খ. বন্ধুর চরিত্র হতে হবে সুন্দর ও মাধুর্যময় এবং
গ. বন্ধুকে হতে হবে নেককার ও পুণ্যবান।'
৬।ইমাম জয়নুল আবেদীন (রহঃ) পাঁচ(৫) শ্রেণীর মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ
করেছেন। ওই পাঁচ শ্রেণীর মানুষ হলো:-
ক.মিথ্যাবাদী
খ.ইতর
গ.কৃপন
ঘ.অভদ্র
ঙ.নির্দয়।
৭।ইরানের বিখ্যাত মনীষী শেখ সাদী (রহঃ) বলেছেন: 'সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ' । এই উক্তির মুলকথা হচ্ছে, একজন
উত্তম বন্ধু যেমন জীবনের গতি পাল্টে দিতে পারে, তেমনি একজন অসৎ বন্ধু জীবনকে ধ্বংসের
চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে দিতে পারে । তাই যাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করব তাকে আগেই যাচাই-বাছাই
করে নিতে হবে। জ্ঞানী, সৎ, ন্যায়পরায়ণ, ত্যাগী, নিঃস্বার্থ, চরিত্রবান, সহজ-সরল ইত্যাদি
গুণাবলি দেখে বন্ধু নির্বাচন করলে আশা করা যায় সে উত্তম বন্ধু হতে পারে।
৮।ইমাম জাফর সাদেক (রহঃ) তিন(৩) শ্রেণীর লোকের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেছেন।
ওই তিন শ্রেণী হলো-
ক.বিশ্বাসঘাতক
খ.নির্মম
গ.মিথ্যাবাদী।
তাহলে আমরা বুঝতে পারলাম একজন ভাল বন্ধু একজন খারাপ মানুষকে ভাল বানাতে সাহায্য করতে পারে পক্ষান্তরে খারাপ বন্ধু একজন ভাল মানুষকে নিয়ে যেতে পারে অধ:পতনের দিকে। তাই বন্ধুত তৈরীর আগে অবশ্যই যাচাই-বাছাই করা আবশ্যক।কাজেই আমাদের এমন লোককেই বন্ধু বানানো উচিত যে আল্লাহ ও তার রাসূলকে ভালবাসেন। যে সততা ও নীতির প্রশ্নে অটুট। যে আমাকে ভাল কাজে সাহায্য করতে পারবে। পক্ষান্তরে এমন মানুষকে মনে প্রাণে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়, যে আল্লাহ ও তার রাসূলের সাথে দুশমনী মনোভাব পোষণ করে এবং সততা ও চরিত্রের প্রশ্নে উত্তীর্ণ নয়। বন্ধুত্বের একটা গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো সততা রক্ষা করা।বন্ধুকে সম্মান করা বন্ধুত্বের নীতিমালার আরেকটি বৈশিষ্ট্য। কারণটা হলো বন্ধুত্বের মধ্য দিয়ে যে বন্ধন তৈরি হয়, তার ফলে একজনের প্রতি আরেকজনের একটা অধিকার সৃষ্টি হয়, আর সেই অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা অবশ্য কর্তব্য। সর্বোপরি একজন মুসলমান হিসেবে দায়িত্ব হলো অপরের সম্মান রক্ষা করা।
ইসলামের দৃষ্টিতে বন্ধুদের সাথে আচরণহতে হবে সদয়, আন্তরিক এবং বিনয়ী। তবে গঠনমূলক সমালোচনাও বন্ধুত্বের মাঝে বিদ্যমান অনিবার্য একটি শিষ্টাচার।গঠনমূলকভাবে বন্ধুর দোষগুলো ধরে দিলে বন্ধু রাগ তো করবেই না বরং ভাববে সেই তো পরম শুভাকাঙ্ক্ষী। তাই তাদের মধ্যকার বন্ধুত্ব আরো দৃঢ় আরো গভীর হবে। তবে কখনো ভুল করলে ক্ষমা চাওয়াটাও একটা শিষ্টাচার। কেননা ভুলস্বীকারের মধ্যেই রয়েছে সংশোধনের বীজ। ইমাম আলী (আ) বলেন:- “সবচেয়ে মন্দ লোক হলো সে-ই যে ভুল স্বীকার করতে রাজি নয়।”
ইসলামের দৃষ্টিতে বন্ধুদের সাথে আচরণহতে হবে সদয়, আন্তরিক এবং বিনয়ী। তবে গঠনমূলক সমালোচনাও বন্ধুত্বের মাঝে বিদ্যমান অনিবার্য একটি শিষ্টাচার।গঠনমূলকভাবে বন্ধুর দোষগুলো ধরে দিলে বন্ধু রাগ তো করবেই না বরং ভাববে সেই তো পরম শুভাকাঙ্ক্ষী। তাই তাদের মধ্যকার বন্ধুত্ব আরো দৃঢ় আরো গভীর হবে। তবে কখনো ভুল করলে ক্ষমা চাওয়াটাও একটা শিষ্টাচার। কেননা ভুলস্বীকারের মধ্যেই রয়েছে সংশোধনের বীজ। ইমাম আলী (আ) বলেন:- “সবচেয়ে মন্দ লোক হলো সে-ই যে ভুল স্বীকার করতে রাজি নয়।”
বিপদে বন্ধুর পরিচয়। সত্যিকারের বন্ধু কখনো বন্ধুর বিপদ দেখে পালিয়ে যেতে পারে না। বরং তারা বিপদে- আপদে পরস্পরকে সাহায্য করে।এ সম্পর্কে একটি বহুল প্রচলিত গল্প আছে। “একবার দুই বন্ধু জঙ্গলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলো। হঠাৎ একটি ভাল্লুক তাদেরকে আক্রমন করতে এলো। দু'বন্ধুর মধ্যে যে গাছে উঠতে জানতো সে অন্যজনকে সাহায্য করার চেষ্টা না করে দৌড়ে গিয়ে গাছে উঠলো। অন্যজন কোন উপায় না দেখে মাটির ওপর মরার মতো শুয়ে রইলো। ভাল্লুক এসে লোকটির মুখ শুঁকে মৃত ভেবে চলে গেল। ভাল্লুক চলে যেতেই গাছের ওপর থেকে লোকটি নিচে নেমে এসে তার বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলো, 'বন্ধু! ভাল্লুক তোমার কানে কানে কি বলল?' লোকটি জবাব দিলো- ভাল্লুকটি আমাকে বলেছে , যে বন্ধু বিপদ দেখে পালিয়ে যায়, সে প্রকৃত বন্ধু নয়; তাকে কখনো বিশ্বাস করো না।”
আমরা জানি যে প্রতি বছর আগষ্টের
প্রথম রবিবার বন্ধু দিবস পালিত হয়।আমাদের উচিত বন্ধুত্বকে একটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ
না রেখে আমাদের সামাজিক জীবনকে আরও সহজ ও সুন্দর
করে গড়া এবং জীবনকে বিপদমুক্ত, নির্মল, আনন্দময়,প্রাণবন্ত, সুখী তথা সফল জীবনের জন্য পরোপকারী, বিশ্বস্ত, ভালো বন্ধু গড়ে তোলা।মহান
আল্লাহ আমাদের যথার্থ বন্ধু নির্বাচন করার তাওফিক দান করুক।

.jpg)

.jpg)

Excellent
উত্তরমুছুন